এডভেঞ্চার বান্দরবান (পর্ব-২)



 হাঁটছি একটা পাহাড়ি পাড়ার উঠোন ধরে। সামনে গভীর জঙ্গল, অজানা-অচেনা পাহাড়ি পথ। এ পাড়ার নাম "বাকত্লাই"। বান্দরবানের থানচি উপজেলা থেকে প্রায় ১৭ কিলোমিটার ভেতরে এর অবস্থান। এখানকার আধিবাসীরা সবাই খ্রিস্টান। এরা সবাই সমাজবদ্ধভাবে জীবন-যাপন করে।

আমরা এখানকার একটা দোকান থেকে এক পাতা 'সিভিট' আর একটা পানির বোতল নিয়ে সামনে পা বাড়ালাম। গন্তব্য আমাদের অনেক দূর। সেই 'কপিতাল' পাহাড়ের পাদদেশে। এখান থেকে প্রায় ২.৫ ঘন্টার পথ। সময়ক্ষেপন না করে যতদ্রুত সম্ভব আমাদেরকে এ পথ পারি দিতে হবে। ঘড়িতে তখন ৪:৩০ বা এর কিছু বেশি হবে হয়তো। পথ চলছি আমরা দুইজন। সম্বল কেবল- দুটি ব্যাগ আর কিছু শুকনো খাবার।
মেঘাচ্ছন্ন আকাশ। কালো মেঘে ঢেকে গেছে পৃথিবী। ধীরে ধীরে চারদিক কেমন অন্ধকার হয়ে আসছে। ঘড়িতে ৪টা বাজলেও পাহাড়ি এলাকায় এখন সন্ধ্যা, কিন্তু যেভাবেই হোক আজকে রাতে আমাদের এ পাড়া ত্যাগ করতে হবে। তাই 'চার-পাঁচ' না ভেবে আল্লাহর উপর ভরসা করে শুরু করলাম পথচলা।
পাড়া থেকে বের হয়ে একটা ঢালু পথ দিয়ে খানিকটা নিচে নেমে এলাম। এখান থেকে পথটা সমতল। অন্ধকারে দূরের জিনিসগুলো ঝাপসা ঝাপসা লাগছে। দূর থেকে ভেসে আসছে ঝিঁঝিঁ পোকার বিরক্তিকর শব্দ। আকাশে তখন বিজলি চমকাচ্ছে। বুঝতেই পারছি, বৃষ্টি শুরু হবে। আমরা আমাদের হাঁটার গতি বাড়িয়ে দিলাম।
চারদিকে অন্ধকার। নিরব-নিস্তব্ধ, দূর্গম পাহাড়ি পথ। আকাশে মেঘের ঘুড়ুম ঘুড়ুম আওয়াজ, অন্ধকারে ঝিঁঝিঁ পোকার ভয়ংকর শব্দ। সব মিলিয়ে একটা ভুতুরে অবস্থা তৈরি হয়েছে এখানে। যদিও আমাদের চোখে-মুখে কোন ভয় নেই; কিন্তু পরিবেশটা সত্যিই ভয়ংকর।
মোবাইলে নেট নাই। এখানে নেট থাকবে, এটা আশা করাও বোকামী। টুপটুপ বৃষ্টি পড়ছে। টুপটুপ না, ভারি বৃষ্টি। আমার ফোনের 'গুগল ম্যাপ' ধরে আন্দাজ করে পথ চলছি। এখন আমরা বাকতলাই থেকে অনেক দূর। খুবই সাবলীল আমাদের পথচলা।
একটু সামনে আগাতেই হঠাৎ একটা বিপাকে পড়ে গেলাম। সামনে দুইটা রাস্তা দু'দিকে চলে গেল। একটা ডান দিকে একটু উপরের দিকে, আরেকটা বামের পথে। বুঝতে পারছি না কোন দিকে যাবো। সুহাইল ভাই, ডান দিকে যাওয়ার পরামর্শ দিলেন। কিছুটা উপরে উঠার পর কেমন অস্বস্তি লাগছে। মনে হচ্ছে এ পথে মানুষ চলাচল করে না। সুহাইল ভাইকে বললাম, মনে হচ্ছে— ভুল পথে হাঁটছি। তারপর নিচে নেমে আবার বামের পথ ধরলাম। একটু সামনে আগাতেই একজন পাহাড়ির দেখা মিলল। আমরা ঠিক পথে আছি কি না জানার জন্য সুহাইল ভাই জিজ্ঞাসা করলেন, 'কপিতাল' এ পথে না! বলল, হ্যা এ পথেই। এখন আমরা নিশ্চিন্তে পথ চলছি।
পাহাড়ে বৃষ্টি হচ্ছে। ভারি বৃষ্টি। সন্ধ্যা পেরিয়ে এখানে এখন রাত। চারপাশে সব অন্ধকার। সবকিছু খুব ঝাপসা লাগছে, ভয় হচ্ছে। এখনো রাস্তা শেষ হচ্ছে না বলে একটা অস্বস্তি কাজ করছে। মনে মনে আল্লাহর নাম নিচ্ছি খুব করে। সুহাইল ভাই, রাসূল সা. এর একটা দোয়ার কথা স্মরণ করিয়ে দিলেন। এই দোয়া পড়লে নাকি আল্লাহ পথকে সংকীর্ণ করে দেন। আমি দোয়া পড়তে লাগলাম।
হঠাৎ সুহাইল ভাই থমকে দাঁড়াল! বুঝতে পারলাম না কী হলো। মোবাইলের লাইট জ্বালিয়ে দেখি, তার ঘাড়ে একটা জোঁক বসে আছে। ভয়ে আমার কলিজা শুকিয়ে গেছে। সুহাইল ভাই, হেচকা টানে এটাকে ছাড়িয়ে নিলেন। তারপর স্বাভাবিক গতিতেই আবার হাঁটতে লাগলেন।
কিন্তু সমস্যা হলো, এখন তো আমি আর হাঁটতে পারছি না। আমার পায়ে পায়ে কেমন ভারি লাগছে। মনে হচ্ছে, এই বুঝি কোন জোঁক আমার গায়ে উঠে এলো। পায়ের মধ্যে পাতা বাজলেও আমি লাফিয়ে উঠছি। এদিকে রাস্তা খুব পিচ্ছিল! কখন স্লীপ খেয়ে পড়ে যাই, আল্লাহই ভালো জানে। খুব ভয়ে ভয়ে পথ চলছি।
আমার এই করুন অবস্থা দেখে সুহাইল ভাই দিলেন ধমক, "ঐ এমন করছো ক্যান? জোঁক কামড় দিলে কি মানুষ মরে যায় নাকি...? স্বাভাবিক ভাবে হাঁটো। আমি নিজেকে গুছিয়ে নিয়েছি বুঝালেও, ভেতরে ভেতরে খুবই ভয় পাচ্ছি।
~দেঢ় ঘন্টা হয়ে গেল আমরা পথ চলছি। পা ধরে আসছে। খুব পিপাসা লেগেছে কিন্তু পানি খাওয়া যাবে না। রাস্তায় পানি না পেলে সমস্যায় পড়ে যাবো–তাই। কিছুটা সামনে যেতেই একটা ঝর্ণার আওয়াজ কানে ভেসে এলো। আমি আওয়াজ ধরে দ্রুত হাঁটতে লাগলাম। যত কাছে যাচ্ছি, আওয়াজটা তত ভয়ংকর রকম সুন্দর লাগছে। প্রায় ১৫ মিনিটের মতো নীচে নামার পর একটা ছোট-খাটো ঝর্ণা চোখে পড়ল। আহ! কীযে ভালো লাগছিল তখন বুঝাতে পারবো না। আমি ঝর্ণার পানিতে অজু করলাম। প্রাণ ভরে পানি খেলাম। একটু বিশ্রাম করে আবার শুরু হলো আমাদের পথচলা।


কপিতাল পাহাড়ের পাদদেশে নাকি একটা যাত্রী ছাউনি আছে। সুহাইল ভাই একটা ভিডিওতে দেখেছিলেন। আমি সেটাকে মাথায় রেখেই দ্রুতপদে হাঁটছিলাম। পাহাড়ের কোল ঘেঁষে এত এত মোড়! প্রতিটি মোড় ঘুরতেই মনে হচ্ছিল, এই বুঝি চলে এলাম। প্রায় তিন ঘন্টা টানা ট্রেকিং করে আমরা কপিতাল পাহাড়ের নিচে এসে পৌঁছালাম, আলহামদুলিল্লাহ!
'কপিতাল পাহাড়' থেকে 'থাইক্ষং পাড়া' এক ঘন্টার পথ আর 'জাদিপাই পাড়া' পৌঁছতে লাগবে ৩ ঘন্টা। এদিকে বৃষ্টির কারণে রাস্তা পুরো কাঁদা হয়ে আছে। চাইলেও কোথাও যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। তাই আজকের রাতটা এখানেই কাটানোর সিদ্ধান্ত নিলাম।

~ পাহাড়ে এখন ভারি বৃষ্টি। দূরের আকাশে বিজলি চমকাচ্ছে। কাঁধ থেকে ব্যাগ নামিয়ে নিজেকে একটু হালকা করে নিলাম। বৃষ্টিতে ভিজে ব্যাগ ভারি হওয়ায় কাঁধটা খুব ব্যথা করছে, ট্র্যাকিংয়ের কারণে এতক্ষণ একদমই টের পাইনি। জুতা খুলে দেখি পা থেকে সমানে রক্ত ঝরছে। বুঝতেই পারছি, জোঁক কামড়ে রক্ত খেয়ে মরে পড়ে আছে কোথাও। সুহাইল ভাইয়ের অবস্থা আরো খারাপ। তারও একাধিক জায়গায় জোঁক কামড়েছে। রক্ত পরিষ্কার করে আমরা নেবানল পাউডার দিয়ে দিলাম।
সুহাইল ভাই খুবই অভিজ্ঞ মানুষ। তিনি জানেন, পাহাড়ে কী রকম সিচুয়েশনে পড়তে হয়। তাই, আগে থেকেই তিনি মুড়ি, শুকনো গুড় ও বাটারবন নিয়ে এসেছেন। আমরা মুড়ি, গুড় ও রুটি খেয়ে ছাউনিতে ঘুমানোর প্রস্তুতি নিলাম।
~যাত্রী ছাউনির চারপাশটা একেবারেই খোলামেলা। রাতে পাহাড়ে এমনিতেই অনেক শীত পড়ে, তার উপর এখন প্রবল বৃষ্টি। সাথে জোরেশোরে বাতাশ বয়ছে। তাই, শীতটা সহ্য ক্ষমতার বাহিরে বলাই চলে। এদিকে আমরা কেউই তেমন শীতের পোশাক আনিনি, যা এনেছিলাম— সেগুলো গায়ে দিয়েই শীত থেকে বাঁচার চেষ্টা করলাম। আমার খুব কষ্ট হচ্ছিল! এমনিতেই শরীরে জ্বর, তার উপর এত শীত!! রীতিমতো আমি থরথর করে কাপছিলাম। ঘুমাতে পারছিলাম না, কেন জানি ঘুম ভেঙ্গে যাচ্ছিল। একটু আধটু আওয়াজ পেলেই উঠে বসে থাকতাম। এভাবেই অনেক কষ্ট করে রাতটা পার হলো।



ফজরের নামাজ পড়তে উঠে দেখি সুহাইল ভাই অজু করতে গেলেন। বাহিরে এখনো বৃষ্টি হচ্ছে। পূর্ব দিকের আকাশটার দিকে তাকিয়ে নিজের অজান্তেই বলে উঠলাম, 'আল্লাহু আকবার'।
দেখলাম, দূরের পাহাড়ে ঐ নীচে সাদা সাদা মেঘগুলো যেন তুলার মতো উড়তেছে। এদিকে ওপাড়ের পাহাড়ের আড়াল থেকে সুবহি সাদিকের রক্তিম লালিমা যেন বাহিরে ছিটকে পড়ছে। আমি নির্বাক হয়ে শুধু তাকিয়ে রইলাম, তাকিয়েই......রইলাম। এই সৌন্দর্য কখনো প্রকাশ করার মতো না, শুধু অনুভব করা ছাড়া। সত্যি বলতে, এটা দেখে গতরাতের সব কষ্ট যেন আমি এক মুহুর্তেই ভুলে গেলাম। আমি কিছু ফটোসেশান করে নামাজ পড়ে নিলাম। এখন আমাদের যাত্রা 'জাদিপাই জলপ্রপাত' এর দিকে।
(চলবে...)

Post a Comment

0 Comments