এডভেঞ্চার বান্দরবান (পর্ব-১)

 সেপ্টেম্বরের ৮ তারিখ। সেদিন ছিল বৃহস্পতিবার। অফিসের প্ল্যান অনুযায়ী আজ থেকে আমার ৪ দিনের ছুটি। স্যারকে আগেই বলেছি, আমার ছুটি লাগবে। ট্যূরে যাবো, বন্ধুদের সাথে ট্যূর। স্যার–একবারের জন্যও না করেননি, শুধু জানতে চেয়েছিলেন–যাবো কোথায়। ছুটি দিয়ে দিলেন, ৪ দিনের ছুটি।

গত এক সপ্তাহ ধরে শরীরে জ্বর। খুব বাজে ভাবে উঠানামা করছে। সারাদিন তেমন জ্বর না থাকলেও, রাতে মারাত্মক জ্বর আসে। ঘেমে পুরো শরীর দূর্ঘন্ধ হয়ে যায়। এদিকে আজ আমার ট্যুরে যাওয়ার কথা। অসুস্থতার জন্য ট্যূর ক্যান্সেল হবে, এটা কোন ভাবেই মন মানছে না। আমিও সাহস হারালাম না। যোহরের পর 'সুহাইল ভাইকে' ফোন দিলাম। ধরলেন না। মেসেজ দিয়ে রাখলাম, তার আপডেট জানার জন্য।
বিকেলের দিকে সুহাইল ভাই জানালেন, যাদের যাওয়ার কথা ছিল, তারা কেউই যাবে না। বিভিন্ন ব্যস্ততায় তারা সফর বাতিল করেছে। মনে হচ্ছে, আপাতত আমাদের দুজনকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আমি তাকে ভরসা দিলাম। মানসিক শক্তি যোগালাম। আমার দিক থেকে আমি কনফার্ম–জানিয়ে দিলাম।
সুহাইল ভাইয়ের পেটের অবস্থাও ভালো না। সারাদিনে খুব দূর্বল হয়ে হয়ে পড়েছেন। ট্যূরে যাবে কি না সন্ধ্যার পর জানাবে। মাগরিবের সালাত পড়ে রুমে বসে আছি। বাহিরে প্রচন্ড গরম থাকলেও, আমার রীতিমতো শীত লাগছে। বুঝতেই পারছি আবার জ্বর উঠতেছে। সুহাইল ভাইকে ফোন দিলাম, " ভাই, না গেলে বলেন, রাতের ট্রেনে আমি বাড়ি চলে যাবো।" এশার পর সুহাইল ভাই জানালেন, শরীর আগে থেকে ভালো। এখন আমরা বের হতে পারি।


~ ঘড়ির কাঁটা তখন 'নয়টা' ছুঁইছুঁই করছে। এশার নামাজ পড়ে, রাতের খাবার খেয়ে নিলাম। এরপর ঔষধ খেয়ে 'কমলাপুরের' পথ ধরলাম। এগারোটায় আমাদের গাড়ি। সময়মতো পৌঁছাতে না পারলে সফর কঠিন হয়ে যাবে। এদিকে রাস্তায় অনেক জ্যাম। শেষ পর্যন্ত ভাগ্য আর বাস্তবতার সাথে যুদ্ধ করতে করতে সাড়ে ১০ টার দিকে আমি কমলাপুর গিয়ে পৌঁছালাম।
~ 'ডলফিনে' ৮৫০ করে ঢাকা-বান্দরবান দুইটা টিকেট কাটলাম। অন্য গাড়িতে ৯০০ করে ভাড়া। সোয়া এগারোটার দিকে গাড়ি আমাদের নিয়ে বান্দরবানের উদ্দেশ্যে ছুটে চলল। ড্রাইভার খুব বিচক্ষণতার সাথে গাড়ি চালাচ্ছেন। পিছনে আমাদের সীট থাকা সত্তেও গাড়িতে তেমন ঝাকি নেই। খুব স্বাভাবিক মানানসই গতিতে সামনে এগিয়ে চলছে গাড়ি।
সুহাইল ভাই, ঘুমানোর চেষ্টা করছেন। আমার চোখে ঘুম নেই। জানালাটা একটু ফাঁক করে রাতের আকাশ দেখছি। বাহিরে ঠান্ডা বাতাস। তারায় জ্বলমল করছে পৃথিবী। আকাশে অনেক মেঘ। মনে হচ্ছে,
বৃষ্টি হবে। দু'পাশের গাছগুলো শো শো করে পিছনের দিকে ছুটে চলছে। আমার কল্পনার একাকিত্ব জুড়ে ভীড় করছে রঙ্গীন সব ভাবনা।

~ রাত ৩টার দিকে আমাদের গাড়ি কুমিল্লার একটা রেস্টুরেন্টে এসে দাঁড়ালো। বাহিরে তখন তুমুল বৃষ্টি। সুহাইল ভাই ঘুমাচ্ছেন। আমি নিচে নেমে অজু-ইস্তেঞ্জা করে আসলাম। শরীরটা তেমন ভালো লাগছে না। কিছু সময় ঘুমানো দরকার। গাড়িতে এসে ঘুমিয়ে পড়তেই আমার ঘুম ভাঙ্গলো ভোর ৫ টায়। আমরা তখন চট্টগ্রামে 'কর্ণফূলী ব্রীজ' পার হচ্ছি। সকালের রক্তিম সূর্যটা এখান থেকে দারুন লাগছে। আমি ফটাফট কিছু ছবি তুলে নিলাম। আনুমানিক 'সাড়ে সাতটার দিকে আমরা বান্দরবান এসে পৌঁছালাম।
~ এবারের যাত্রা 'থানচি'। নৈশর্গিক প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি 'বান্দরবান'। পাহাড়, ঝর্ণা, অসংখ্য নদী ও লেকের সৌন্দর্যে যে কোন ভ্রমণ প্রিয় মানুষই বারবার ফিরে আসে এখানে। আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথ, দু-পাশে সবুজের সমারোহ, স্নিগ্ধ বাতাশ, কোমল মেঘের লুকোচুরি আর মেঘ ছোঁয়ার অনুভূতি পেতে 'বান্দরবান থেকে থানচি' পথে জীবনে একবার হলেও সফর করা উচিৎ।
সকালের নাস্তা খেতে খেতে বিলম্ব হওয়ায় থানচিগামী প্রথম ট্রিপটা মিস করলাম। মনটা খারাপ হয়ে গেল। অনেক্ক্ষণ খোজাখুজি করেও কোন 'চান্দের গাড়ি কিংবা 'বাইক' ব্যবস্থা করতে পারলাম না। অবশেষে পৌনে এগারোটায় ২য় ট্রিপে থানচির পথে রওয়ানা হলাম...!

------------------------------------------------------------------

~বান্দরবান শহর থেকে থানচির দূরত্ব আনুমানিক ৮৫ কি.মি.। ড্রাইভারের ভাষ্যমতে দুপুর ২টা নাগাদ আমরা সেখানে পৌছাবো। গাড়ি চলছে। সামনে আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথ। উঁচু-নিচু রাস্তা। ঐ তো দূর থেকে বিশাল, বিস্তৃত সবুজ জলরাশি দেখা যাচ্ছে। পাহাড়ি সৌন্দর্যের মুগ্ধতায় ক্লান্ত হয়ে পড়ছে এ চোখ। আমি এখন সুস্থ, পরিপূর্ণ সুস্থ। কোন এক অদৃশ্য শক্তি আমাকে প্রাণবন্ত করছে। সুহাইল ভাই খুব ক্লান্ত। সে ঘুমাচ্ছে। আমি এই পাহাড়ি পথটাকে খুব করে উপভোগ করলাম।
~বান্দরবান থেকে ৩ কিলোমিটার দক্ষিনে অবস্থিত 'মিলনছড়ি'। আমাদের যাত্রাপথেই এর দেখা মিলল। 'মিলনছড়ির' কথা আগে থেকে আমার জানা ছিল না। সুহাইল ভাইই আমাকে এটার সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন। 'মিলনছড়ি' পাহাড়ি পথ, দিগন্তজোড়া সবুজ আর সাঙ্গু নদীর মোহনীয় সৌন্দর্যে আঁকা একটি নান্দনিক চিত্র। এ মুগ্ধতাগুলো শুধু উপভোগ করা যায়, ব্যাখ্যা করা যায় না।
~চলতে চলতে আমরা এখন 'চিম্বুকে'।
চিম্বুক বান্দরবান থেকে ২৬ কি.মি দূরের একটা পাহাড়। পাহাড়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর নয়নাভিরাম দৃশ্যগুলোর জন্য চিম্বুক খুবই অসাধারণ একটা জায়গা। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১৫০০ ফুট উপরে এর অবস্থান। এখান থেকে সূর্যদয়টা ও সূর্যাস্ত এতটা আকর্ষণীয় দেখা যায় যে, এখানে ' চিম্বুকের সূর্যদয়' নামে একটা পয়েন্ট সেট করা হয়েছে। চিম্বুক পাহাড়ের এই পয়েন্টে নেমে সবাই ছবি তোলে। এখানকার ভিউগুলো সত্যিই অসাধারণ, রোমাঞ্চকর। এখানে আমারো কিছু পিক আছে। এই পিকগুলো নিয়েও একটা মজার কাহিনি আছে। থাক, সেটা আর এখানে বললাম না...!
😊
বিরতি শেষ করে আমরা আবার চলতে লাগলাম। সামনে একটা আর্মি ক্যাম্পে চেকিংয়ের জন্য গাড়ি দাঁড়ালো। আমরা আমাদের নাম, ঠিকানা, এনাইডি কার্ড জমা দিয়ে রেজিস্ট্রি করে নিলাম।
~এখন আছি নীলগিরি। নীলগিরিকে বলা হয় 'বাংলার দার্জিলিং'। নীলগিরিতে দিগন্তজোড়া সবুজ পাহাড় আর সাদা মেঘের কোলাহল যে কাউকেই মুগ্ধ করে ছাড়বে। এ মুগ্ধতা শুধু পাহাড়ের সৌন্দর্য না; এটা আমার আল্লাহর সুনিপুণ কারুকার্যের সৌন্দর্য। দুপুর ঠিক ২টায় আমরা থানচি এসে পৌঁছালাম।
আমাদের এবারের যাত্রা বাকত্লাই 'অফরুটে' দূর্গম পাহাড়ি পথে। দেখবো সৌন্দর্যের পাহাড়ি রহস্য, ঝর্ণা আর বৈচিত্র্যময় পাহাড়ি মানুষের জীবনকাল।
----------------------------
~বেলা তখন ২টা পেরিয়ে গেছে। 'থানচি' বাসস্ট্যান্ডে গাড়ি থেকে নামলাম। ক্লান্ত শরীর। জ্বরটাও কেমন বাড়ছে বাড়ছে মনে হয়। পেটে মারাত্মক ক্ষুধা, মাথাটা ঝিমঝিম করছে। দীর্ঘ ৪ঘন্টার জার্নি শেষ করে 'বান্দরবান' থেকে 'থানচি' এসে পৌঁছালাম।
পাশের একটা মসজিদে 'যোহরের' সালাত আদায় করলাম। নামাজ শেষ। কিছু খেতে হবে। অনেক্ষন খোঁজাখুঁজির পর একটা হোটেলে ডিম-ভাত খেলাম।
তরকারিটা একদমই খাওয়ার উপযুক্ত না। কোন স্বাধই পাচ্ছি না। না আছে ঝাল- আর না আছে মিষ্টি। মনে হচ্ছে, একটা ডিম আর 'সাঙ্গু নদীর' পানি খাচ্ছি। শরীর ভালো না, তাই খাবারও ঢুকছে না। কিছু না খেয়ে ঔষধও খেতে পারবো না। 'সুহাইল ভাই বললেন, যতটুকু পারো, ঠেলে পেটে ঢুকাও! পরে আর খাবার পাইবা না। আজ অবশ্যই অনেকটা পথ হাঁটতে হবে। খাবার পর্ব শেষ করে সাঙ্গু নদীর ব্রীজে এসে দাঁড়ালাম।
সামনে এঁকেবেঁকে বয়ে চলা কল্পনার 'সাঙ্গু'। ডানদিকে বিশালাকার পাহাড়। আকাশে তখন অনেক রোদ, তাকাতে পারছিলাম না। সূর্যের আলোকরশ্মিতে সাঙ্গুর পানিগুলো চিকচিক করছে। এখানে কিছু ফটোসেশান করে আমরা বাকত্লাইয়ের পথ ধরলাম।
~'থানচি' থেকে 'বাকত্লাই পাড়া' পর্যন্ত ৬০০ টাকা ভাড়ায় একটা বাইক ম্যানেজ হলো। মূলত এখান থেকেই শুরু হলো, অফরুটে আমাদের এডভেঞ্চার পথচলা।
# পাহাড়ি আকাশে এখন মেঘ জমে আছে। বুঝাই যাচ্ছে বৃষ্টি হবে। 'ড্রাইভার' বললেন, ভাই তাড়াতাড়ি উঠেন! বৃষ্টি আসার আগে আমাদের 'তমাতুঙ্গী' পার হতে হবে। 'পনের মিনিটের মধ্যেই আমরা তমাতুঙ্গী চলে এলাম।
'তমাতুঙ্গী' বান্দরবানের অসাধারণ সব 'ভিউ পয়েন্ট' গুলোর অন্যতম একটি।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন ব্রিগেডের (ইসিবি) উদ্যোগে 'থানচি' উপজেলা সদর থেকে প্রায় চার কিলোমিটার দূরে তমা তুঙ্গী নামে পর্যটনকেন্দ্রটি গড়ে তোলা হয়। থানচি-রেমাক্রী-মদক-লিকক্রে নতুন সড়ক নির্মাণ প্রকল্পের কাজ করার সময় তমা তুঙ্গী পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তোলেন সেনাবাহিনীর ইসিবি ব্রিগেড।
তমাতুঙ্গীতে ট্যূরিস্টদের জন্য দু'টি ভিউ পয়েন্ট রয়েছে। 'ভিউ পয়েন্ট-১' ও 'ভিউ পয়েন্ট-২'।
★ ভিউ পয়েন্ট-১ থেকে বাংলার সর্বোচ্চ পর্বত শৃঙ্গ "তাজিংডং, কেওক্রাডং ও ক্রাউডং (ডিম পাহাড়) একসাথে অবলোকন করা যায়।
★ আর ভিউ পয়েন্ট-২ তে রয়েছে দারুন একটা বিশালাকার বটগাছ। সিড়ি বেয়ে উপরে উঠে দূরের আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথের দারুন একটা দৃশ্য দেখা যায়।
মনে আছে, এই জায়গাটায় এসে যখন তাজিংডং অভিমুখী সামনের আঁকাবাঁকা রাস্তাটা দেখলাম! মনে হ্লো— এই পর্যন্ত এটা আমার জীবনের সব থেকে বড় পাওয়া হয়তো। সংক্ষিপ্তভাবে তমাতুঙ্গী ভিউ পয়েন্টটা উপভোগ করে আমরা বাকত্লাইয়ের পথে রওয়ানা হলাম।
(চলবে...)


Post a Comment

0 Comments